বাংলাদেশের অতি দারিদ্র্য বিমোচনের সংগ্রাম
- বিয়র্ন লোমবোর্গ
বাংলাদেশ যেসকল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জসমূহের মুখোমুখি, সেগুলোর মধ্যে দারিদ্র্য অবশ্যই সবচেয়ে গুরুতরগুলোর একটি। এবং এখনও এই ক্ষেত্রে প্রচুর কাজ করার আছে।
চরম দারিদ্রতার হার ২০০০ সালের ৩৪ শতাংশ থেকে কমিয়ে আজ মাত্র ১৩ শতাংশে আনা সত্ত্বেও, ২০ লাখ বাংলাদেশী এখনও দরিদ্রতম হিসেবে বিবেচিত পরিস্থিতিতে বসবাস করছে। প্রতি দিন ৪৩ টাকারও কম পরিমাণ অর্থে জীবন ধারণ করা অত্যন্ত কঠিন হতে পারে, এবং কারো কারো ক্ষেত্রে, এই পরিস্থিতি এক ধরণের ফাঁদ তৈরি করতে পারে যা থেকে পরিত্রাণ পাওয়া প্রায় অসম্ভব।
হতদরিদ্র জনগণ সাধারণত জমির মালিক হয় না এবং তারা কম মজুরীর শ্রমজীবী কর্মকাণ্ডের ফাঁদে আটকা পড়ে থাকে। তারা অস্তিত্ব রক্ষার প্রান্তে বসবাস করছে। আর যখন কেউ শুধুমাত্র তার আজকের অস্তিত্ব রক্ষার জন্যই সংগ্রাম করে যাচ্ছে, আগামীকালের ব্যাপারে চিন্তা করা বা ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করার মতো বিলাসিতা তার থাকবেনা।
বাংলাদেশ সরকার সম্প্রতি নিজেদের কাছে প্রতিজ্ঞা করেছে যে ২০২০ সাল নাগাদ আরও ৬ মিলিয়ন জনগণকে চরম দারিদ্রতা থেকে বের করে আনবে। একইভাবে, জাতিসংঘের ২০৩০ সালের উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রাগুলোর একটি, টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা, হলো চরম দারিদ্রতা সম্পূর্ণভাবে নির্মূল করা। উভয় ক্ষেত্রেই লক্ষ্যে পৌঁছাতে অনেক পরিশ্রম করতে হবে। কিভাবে আমরা সবচেয়ে কার্যকরী উপায়ে চরম দারিদ্রতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে পারি?
আমাদের প্রকল্প, “বাংলাদেশের অগ্রাধিকারসমূহ” , দেশের জন্য বিভিন্ন ধরনের সম্ভাবনার পরিসর নিয়ে বিশ্লেষণ করে। আমাদের অর্থনীতিবিদদের মধ্যে দুজন, ব্র্যাক ইন্টারন্যাশনাল -এর মুনশী সুলাইমান এবং রোটারডামের ইরাসমাস বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারজানা মিশা, বাংলাদেশে দারিদ্র্য মোকাবেলা করার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তিনটি উপায় বিশ্লেষণ করে দেখেছেন।
| কর্মসূচি | ব্যয়িত প্রতি টাকায় সর্বোমোট যত টাকার সুবিধাসমূহ |
|---|---|
| নগদ অর্থ হস্তান্তর | ০.৮ |
| জীবিকা | ১ |
| উত্তরণ | ২ |
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে, কেনিয়া ও উগান্ডার মতো দেশগুলোতে নগদ অর্থের হস্তান্তর বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে, এবং আমাদের অর্থনীতিবিদগণ এই পদ্ধতিটিই সর্বপ্রথম বিশ্লেষণ করেছিলেন। এই ধরনের কর্মসূচিতে গ্রাহকদেরকে, সাধারণত যারা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, অর্থ ব্যবহারের বিষয়ে কোন শর্ত দেওয়া ছাড়াই একটি এককালীন অর্থ হস্তান্তর করা হয়।
কোন শর্ত ছাড়াই অর্থ প্রদান কেন? দেখা গেছে যে বেশিরভাগ প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণায় এটিকে সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি হিসেবে পাওয়া গিয়েছে, যা এটি এতটা জনপ্রিয় হয়ে ওঠার একটি অন্যতম কারণ। যদিও আমাদের পর্যালোচিত নগদ অর্থ হস্তান্তরের ঘটনাসমূহ অনুযায়ী, যেখানে প্রতিটি প্রাপক পারিবারের পেছনে খরচ হয়েছে ১৮,০৯৬ টাকা, প্রতি ১০০ টাকার মধ্যে তারা মাত্র ৮০ টাকা সঠিকভাবে খরচ করেছে। এই কৌশলগুলো অন্যান্য কৌশলের তুলনায় কার্যকরী না হওয়ার পেছনে একটি কারণ হলো যে সময়ের সাথে এর প্রভাব কমে গিয়েছে - চরম দারিদ্রতায় বাস করা কারও জন্য একটি এককালীন অর্থ-সাহায্য অল্প সময়ের জন্য সহায়ক হতে পারে, কিন্তু এর প্রভাব ক্ষণস্থায়ী।
দ্বিতীয় কৌশলটি গতানুগতিকভাবে বেশিরভাগ দারিদ্র্য বিমোচন কৌশলগুলো যা করেছে তাকেই গুরুত্ত্ব দেয়: মানুষকে একটি অর্থোপার্জন ভিত্তিক "উৎসাহ" প্রদান করা, যাতে তারা নিজেরাই উন্নতিলাভ করতে পারে। তথাকথিত "অর্থোপার্জন ভিত্তিক কর্মসূচি" -সমূহ কৃষি-বিষয়ক প্রশিক্ষণ ও চাষাবাদের উপকরণসমূহ যেমন কৃষকদের উন্নত বীজ দিতে পারে।
আমাদের গবেষকদের চর্চিত কিছু জীবিকা সম্পৃক্ততা অন্যগুলোর তুলনায় বেশী আশাপ্রদ ছিল, এবং এই ধরনের একটি প্রোগ্রামের জন্য খরচও ছিল সস্তা – প্রতি পরিবারের জন্য ৭,৮০০ টাকারও কম। কিন্তু এসব প্রচেষ্টায় একান্তভাবে ব্যয়ের ফলাফল ছিল নিছক একতরফা।
দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসার আরেকটি উপায়, এবং আমাদের বিশ্লেষিত তিনটি কৌশলের মধ্যে সবচেয়ে প্রতিশ্রুতিশীল হলো ‘উত্তরণ’। এ পদ্ধতিতে প্রাপককে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় এবং একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত সাহায্য করা হয়।
উত্তরণ কর্মসূচিতে, অংশগ্রহণকারীরা প্রথমে নগদ বা খাদ্যরূপে একটি ছোট উপহার পায়, যা দৈনন্দিন বেঁচে থাকার চাপ কমায় এবং তাদেরকে সঞ্চয় করার ক্ষেত্রে সাহায্য করে। এর পরে, তারা একটি সম্পদ পায়, হয়তোবা একটি গরু বা একটি ছাগল, প্রাথমিক আর্থিক ও কারিগরি শিক্ষাসহ। এই অংশে প্রায়ই একজন পশু বিশেষজ্ঞ দ্বারা পশুপালনের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। অনেক উত্তরণ কর্মসূচিতে স্বাস্থ্যসেবার সমর্থন প্রদান করা হয়ে থাকে, যেন অংশগ্রহণকারীরা কোন জরুরী অবস্থায় সম্পদ বিক্রি করে দিতে বাধ্য না হয়। অবশেষে, অংশগ্রহণকারীরা সামাজিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আত্মবিশ্বাস লাভ করে - যেটি দারিদ্র্য বিমোচনে একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, যা প্রায়শই উপেক্ষা করা হয়।
অর্থ, সম্পদ, এবং আর্থিক ও সামাজিক সমর্থন আকারে এই সহযোগিতা অংশগ্রহণকারীদের একটি প্রদত্ত সময়সীমায় চরম দারিদ্রাবস্থা “উত্তরণ” -এর মাধ্যমে বের হয়ে আসার পথ দেখায়।
আমাদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই ধরনের একটি প্রোগ্রামের খরচ তুলনামূলকভাবে ব্যয়বহুল; প্রতি পরিবারের জন্য আনুমানিক ২৩,৪০০ টাকা। কিন্তু এর সুবিধাগুলো উল্লেখযোগ্যও হবে। উত্তরণ কর্মসূচি প্রাপকদের আয় অন্তত এক-তৃতীয়াংশ বৃদ্ধি করবে। এবং এটা বলা যায় যে পারিবারিক সুযোগ সুবিধা সম্পর্কে কিছুটা কমই বলা হয়েছে, কারণ এই গবেষণা শুধুমাত্র আয়ের উন্নতি দেখিয়েছে কিন্তু পরিবারের শিশুদের পুষ্টি সম্পর্কিত উন্নয়ন দেখায়নি।
সর্বমোট, বাংলাদেশে উত্তরণ কর্মসূচিতে প্রতি এক টাকা ব্যয় করে দুই টাকা সমান সামাজিক কল্যাণ করা যেতে পারে, অংশগ্রহণকারীদের ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয়ের ব্যবস্থা এবং, অবশেষে, চরম দারিদ্র্য থেকে মুক্তির ব্যবস্থা করে দেয়ার মাধ্যমে। বেশিরভাগ উন্নতি, সুবিধাভোগীদের জীবিকা ব্যবস্থার পরিবর্তন, এবং সাধারণ দিনমজুর অবস্থা থেকে উন্নতিলাভ করে স্ব-কর্মসংস্থানের কারণে হয়। এবং তাৎপর্যপূর্ণভাবে, আমরা প্রমাণ পেয়েছি যে ইতিবাচক উত্তরণ কর্মসূচির প্রভাব কর্মসূচি সমাপ্তির পরও দীর্ঘস্থায়ী হয় বছরের পর বছরের; যার মানে হল অংশগ্রহণকারীদের নিজেদের দীর্ঘ সময়ের জন্য দারিদ্র্য থেকে বের করে আনার সম্ভাবনা আছে।
চরম দরিদ্রদের সাহায্য করার ক্ষেত্রে এটি একটি বেশ মর্যাদাপূর্ণ সুফল। আমাদের বিশেষজ্ঞরা বিশ্বাস করেন যে বাংলাদেশে জীবিকা এবং নগদ অর্থ হস্তান্তর কর্মসূচির আরও দীর্ঘমেয়াদী প্রভাবের উপর আরও গবেষণা করা উচিত। কিন্তু আমাদের গবেষণার উপর ভিত্তি করে, এই তিনটি কৌশলের মধ্যে ‘উত্তরণ’ –ই সবচেয়ে বেশী আশাপ্রদ বলে মনে হয়।
আসন্ন প্রবন্ধগুলোতে, আমরা বিদেশী ও জাতীয় উন্নয়ন অর্থ দিয়ে আর কি কি করতে পারি সে বিষয়ে “বাংলাদেশের অগ্রাধিকার” দৃষ্টিপাত করবে। এই দারিদ্র্য নীতিগুলো হল, দেশ মনোনিবেশ করতে পারে এমন ৭৮টি পদ্ধতির মধ্যে মাত্র তিনটি। আপনার কি মনে হয়? এগুলো কি বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে ভাল বিনিয়োগগুলোর মধ্যে কয়েকটি? copenhagen.fbapp.io/povertybangla -এ আপনার বক্তব্য শোনা যাক। বাংলাদেশ কোন ক্ষেত্রে সবচেয়ে ভালো করতে পারে সে বিষয়ে আলোচনা শুরু করা যাক।
ড. বিয়র্ন লোমবোর্গ হলেন কোপেনহেগেন কনসেনসাস সেন্টার -এর প্রেসিডেন্ট, যিনি ব্যয়-সুবিধার মাধ্যমে বিশ্বের সবচেয়ে বড় বড় সমস্যাগুলোর সেরা সমাধানের শ্রেনীবিন্যাস করেছেন। তিনি টাইম ম্যাগাজিন কর্তৃক বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী ১০০ ব্যক্তির একজন হিসেবে মূল্যায়িত হয়েছেন।