উন্নত প্রযুক্তি কিভাবে শহরের বায়ুকে বিশুদ্ধ করতে পারে - এবং জীবন বাঁচাতে সাহায্য করে
- বিয়র্ন লোমবোর্গ
শুষ্ক মৌসুমে, ঢাকা বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরগুলোর মধ্যে অন্যতম। বছরের এই সময়ে বায়ু দূষণের মাত্রা আন্তর্জাতিক মানের চেয়ে ১৩-১৬ গুন বেশি বেড়ে যায়, এবং বাহিরের এই বায়ু দূষণ প্রতি বছর শহরের ১৪,০০০ অধিবাসীর প্রান কেঁড়ে নেয়।
রাজধানীতে বায়ু দূষণ কমানোর প্রয়োজন সুস্পষ্ট বলেই মনে হয়। কিন্তু বাহিরের বায়ু দূষণ মোকাবেলায় অপ্রতুল সম্পদের ব্যবহারের মানেই হল জাতীয় বাজেট, আন্তর্জাতিক দাতাগণ এবং সাধারণ নাগরিকদের কাছ থেকে অন্যান্য আরও কার্যকর প্রস্তাবের কারণে কম অর্থায়ন।
বাংলাদেশের অধিকারসমূহ, ব্র্যাক এবং বিভিন্ন অঞ্চলের ও বিশ্বের বেশ কিছু শীর্ষ অর্থনীতিবিদের সহযোগিতায়, দেশের জন্য শ্রেষ্ঠ নীতিগুলোকে অগ্রাধিকার প্রদানে সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেয়।
বাহিরের বায়ু দূষণের মোকাবিলা করা বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই বেশ কঠিন হয়, কারণ এটি অসংখ্য উৎস থেকে উদ্ভূত, যার প্রতিটি দূষণমুক্ত করা ব্যয়সাধ্য। কিন্তু ঢাকার পরিস্থিতি ব্যতিক্রম, কারণ বায়ু দূষণের একটি বড় অংশ একটি একক উৎস থেকেই উদ্ভূত: ইট উৎপাদন।
প্রতি বছর, নির্মাণ কাজের জন্য ঢাকার ১,০০০ -এরও বেশী ভাটা ৪ বিলিয়ন ইট উৎপাদন করে। এই ইট ভাটাগুলো রাজধানীতে বায়ু দূষণকারী সমস্ত সূক্ষ্ম বস্তুকণার প্রায় ৪০ শতাংশ নির্গত করে; যা প্রতি বছর আনুমানিক ২,০০০ মানুষের মৃত্যুর জন্য দায়ী। আর যেহেতু ইট শুধুমাত্র শুষ্ক মৌসুমেই তৈরী করা যায়, ভাটাগুলো বছরের এই সময়টিতে বায়ু দূষণের পরিমাণ আরও বাড়িয়ে দেয়, যখন বায়ুর গুণগতমান এমনিতেই যথেষ্ট খারাপ থাকে।
বেশীরভাগ ইট-প্রস্তুতকারক স্থায়ী-চিমনী নামে পরিচিত ভাটা ব্যবহার করে থাকেন, যেগুলো জ্বালানী অপচয়কারী, উচ্চমাত্রায় দূষণকারী এবং ব্যাপকভাবে নিম্নমানের, নোংরা কয়লা পোড়ায়। এধরনের ভাটাগুলোর উন্নতিকল্পে ব্যবহৃত প্রযুক্তিগুলো, তথাপি, অসাধারণ সব সুফলের প্রতিশ্রুতি দেয় – সামগ্রিকভাবে বেসরকারি মালিক, এবং পরিবেশ ও সমাজ উভয়ের জন্যই।
বায়ু দূষণ হ্রাস করার জন্য, হয় ভাটাগুলোকে সম্পূর্ণ নতুনভাবে প্রতিস্থাপন করতে হবে, যেগুলো আরও দূষণমুক্ত এবং কার্যকর, অথবা সেগুলোর সংস্কার করা যেতে পারে যেন সেগুলো আরও বিশুদ্ধ এবং উত্তমরূপে জ্বলে। আমাদের গবেষণায়, একটি সাধারণ সংস্কারের মাধ্যমে ভাটাগুলোকে “সংশোধিত আঁকাবাঁকা” আকৃতি প্রদান করার উপর বিশ্লেষণ করা হয়েছে, যা সবচেয়ে ভালো মানের নতুন হাইব্রিড হফম্যান ভাটার ব্যবহার পর্যন্ত পৌঁছেছে
ভাটার প্রকার | ব্যয়িত প্রতি টাকায় সর্বমোট যত টাকার সুবিধাসমূহ পাওয়া গিয়েছে |
---|---|
স্থায়ী-চিমনীর ভাটাগুলোকে সংশোধিত আঁকাবাঁকা আকৃতির ভাটায় রুপান্তর | ৮ |
নতুন হাইব্রিড হফম্যান ভাটা | ৪ |
হাইব্রিড হফম্যান ভাটাগুলোতে সামগ্রিকভাবে অধিক সুফলের নিশ্চয়তা থাকলেও, এই প্রযুক্তিতে -১৬০ মিলিয়ন টাকার মত বড় বিনিয়োগের প্রয়োজন রয়েছে। অন্যদিকে, একটি বিদ্যমান স্থায়ী-চিমনীর ভাটাকে সংশোধিত আঁকাবাঁকা আকৃতির ভাটায় উন্নীত করা ৪০ গুন বেশি সস্তা।
সবচেয়ে সম্ভাবনাময় কৌশলে পরিণত হয়েছে এই সংস্কার, যা ব্যয়িত প্রতি টাকায় ৮ টাকার সমান কল্যাণ বয়ে আনে। যদি এই ধরনের আঁকাবাঁকা আকৃতির ভাটা পুরো ঢাকা জুড়ে ব্যবহৃত হতো, প্রতি বছর ৮০০ -এর অধিক জীবন রক্ষা করার সাথে সাথে এটি ভাটা থেকে সৃষ্ট বায়ু দূষণ ৪০ শতাংশ কমিয়ে দিত। ভাটার পরিচালনা খরচ বাবদ এতে বার্ষিক প্রায় ৪০৮ মিলিয়ন টাকা খরচ হবে। কিন্তু উপকার হবে অপরিসীম। শুধুমাত্র স্বাস্থ্য খাতেই বার্ষিক লাভ ১.৭ বিলিয়নের সমপরিমাণ হবে। কার্বন নির্গমনে হ্রাস ৮০ মিলিয়ন টাকার কল্যাণ বয়ে আনবে। এছাড়াও, ব্যক্তিগত ভাটা পরিচালকেরা বিভিন্ন ধরনের সুবিধা পাবে, যেমন উন্নতমানের ইট এবং নিম্ন জ্বালানী খরচ। সব মিলিয়ে, বিনিয়োগকারী এবং মালিকদের মুনাফায় অতিরিক্ত ১.৪ বিলিয়ন টাকা যোগ হবে।
একটি স্থায়ী-চিমনীর ভাটাকে আঁকাবাঁকা আকৃতির ভাটায় উন্নীত করতে ৩ মাস সময় লাগে, এবং প্রতি ভাটায় ৪ মিলিয়ন টাকা খরচ হয়। উন্নত ভাটাগুলো আরও কার্যকরভাবে ইটকে উত্তপ্ত করে, কারণ গরম বাতাস আঁকাবাঁকা ভাবে ইটের উপর দিয়ে বয়ে যায়, যা ইটগুলোকে আরও সমানভাবে উত্তপ্ত করে। এই ভাটাগুলো জ্বালানী খরচ এক-পঞ্চমাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দেয়, যেটি একটি কারণ, যার জন্য মালিক তার বিনিয়োগকৃত অর্থ চার বছরেরও কম সময়ে পরিশোধ করতে পারেন। এই সংস্কার পদ্ধতিটি আকর্ষণীয় এই কারণেও যে এক্ষেত্রে বিদ্যমান ভাটাগুলো স্থানান্তরের প্রয়োজন হয়না।
উন্নত বায়ু প্রবাহের কৌশলের কারণে আঁকাবাঁকা আকৃতির ভাটাগুলো উন্নত মানের ইটও প্রস্তুত করে, যা উচ্চ দামে বিক্রি করা যায়, এবং যা এই সংস্কার পদ্ধতিটিকে এই ব্যবসার মালিকদের কাছে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে। কাওসার আহমেদ মুকুল, সাভারের একটি ইট ভাটার মালিক, যিনি ২০১২ সালে আঁকাবাঁকা আকৃতিতে ভাটাকে রুপান্তর করেছেন, লক্ষ্য করেছেন কিভাবে উন্নত প্রযুক্তি অপচয়ও হ্রাস করে। তার ভাষ্যমতে, রুপান্তরের পর তার পুরাতন স্থায়ী-চিমনীর ভাটার ৬০-৬৫ শতাংশের বিপরীতে নতুন চিমনীতে প্রায় ৯০ শতাংশ চমৎকার মানের ইট উৎপাদিত হয়।
তথাপি, আরও বৃহত্তর পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক সুবিধা অর্জনে ভাটার রুপান্তর এবং সংস্কারকে অবশ্যই পরিশেষে উন্নত কারিগরী এবং প্রায়োগিক মানে পৌঁছতে হবে।
হাইব্রিড হফম্যান ভাটার এর চেয়েও বেশী সামগ্রিক কল্যাণ বয়ে আনার সম্ভ্যাবতা আছে – এই প্রযুক্তির দ্বারা ঢাকার সমস্ত ভাটাগুলোকে প্রতিস্থাপনে প্রতি বছর ২.৫ বিলিয়ন টাকার স্বাস্থ্যসুবিধা অর্জিত হবে। নিম্নমাত্রায় কার্বন নির্গমন ১৬১ মিলিয়ন টাকা সমমূল্যের মঙ্গল করবে, উপরন্তু অধিক কার্যকর এবং উন্নতমানের ইট উৎপাদনের মাধ্যমে মালিকপক্ষের ৮.৬ বিলিয়ন সমমুল্যের মুনাফা হবে। কিন্তু এর মূল্য বেশ চড়া হবে, যা বার্ষিক প্রায় ৩.৩ বিলিয়ন টাকা। শেষপর্যন্ত ব্যয়িত প্রতি টাকা ৪ টাকার সমপরিমাণ কল্যাণ বয়ে আনবে, যা মর্যাদাসম্পন্ন হলেও সংস্কারের মাধ্যমে প্রাপ্ত উন্নত আঁকাবাঁকা আকৃতির ভাটাগুলো থেকে প্রাপ্য ৮ টাকা সমমুল্যের কল্যাণের তুলনায় এটি কোনভাবেই যথেষ্ট নয়।
ইট-উৎপাদন খাতে কার্বন নির্গমন কমাতে আরও অনেক কিছুই করা যেতে পারে। নিম্নমানের কয়লার ব্যবহার থেকে বেরিয়ে আসার মাধ্যমে অথবা ভাটাগুলোকে জনসংখ্যার কেন্দ্র থেকে উল্টোদিকে প্রবাহিত বায়ুর অঞ্চলে অবস্থিত শিল্প এলাকায় স্থানান্তরের মাধ্যমে, ঢাকা আরও বৃহত্তর মাত্রায় বাহিরের বায়ু দূষণ কমাতে পারে।
উন্নতমানের ভাটার মাধ্যমে বায়ু দূষণ নিয়ন্ত্রনে টাকা ব্যয় করে ব্যয়িত প্রতি টাকায় ৮ টাকার সমপরিমাণ মঙ্গল করতে পারে। এই সপ্তাহের শুরুতে আপনারা দেখেছেন, উন্নতমানের রান্নার চুলা কিভাবে ব্যয়িত প্রতি টাকায় ৫ টাকা সমমূল্যের কল্যাণ করার মাধ্যমে আভ্যন্তরীণ বায়ু দূষণের বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারে। আপনার কি মনে হয়, এগুলো বাংলাদেশের ভবিষ্যতের জন্য সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ বিনিয়োগগুলোর মধ্যে কয়েকটি? copenhagen.fbapp.io/outdoorairpollutionbangla -এ আপনার বক্তব্য শোনা যাক। বাংলাদেশের জন্য কোন কৌশলগুলো সবচেয়ে বেশী কল্যাণকর সে সম্পর্কে আলোচনার শুরুতেই আপনার মতামত আমাদের কাম্য।
ড. বিয়র্ন লোমবোর্গ হলেন কোপেনহেগেন কনসেনসাস সেন্টার -এর প্রেসিডেন্ট, যিনি ব্যয়-সুবিধার মাধ্যমে বিশ্বের সবচেয়ে বড় বড় সমস্যাগুলোর সেরা সমাধানের শ্রেনীবিন্যাস করেছেন। তিনি টাইম ম্যাগাজিনের মূল্যায়নে বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী ১০০ ব্যক্তির একজন।
মোসাঃ তাসনুভা বাশার তন্বী কর্তৃক অনূদিত